নবম-দশম শ্রেণির ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং চতুর্থ অধ্যায় ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা সৃজনশীল ও জ্ঞানমূলক প্রশ্নোত্তর
চতুর্থ অধ্যায় ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা ঝুঁকির ধারণা কোনো ঘটনা ঘটবেই এমন নিশ্চয়তা থাকলে সেখানে কোনো ঝুঁকি নেই। আবার অতীতে সংঘটিত কোনো ঘটনার মধ্যেও কোনো ঝুঁকি নেই। কারণ সেটা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে ঘটতে পারে এমন বিষয়ের সাথে ঝুঁিক জড়িত থাকে, কারণ এর মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভবিষ্যতে ‘প্রত্যাশিত ফলাফল’ অর্জিত হবে কি হবে না এ রকম অনিশ্চয়তার মধ্যেই ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। সাধারণত ঝুঁকি বলতে আমরা নেতিবাচক (ঘবমধঃরাব) ফলাফল অর্জনের সম্ভাবনা বুঝে থাকি; কিন্তু আর্থিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বলতে ‘চড়ংরঃরাব’ ও ‘ঘবমধঃরাব’ দুই ধরনের ফলাফল অর্জনের সম্ভাবনাকেই বুঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনাই ঝুঁকি। আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নির্দিষ্ট বিনিয়োগের আয়ের তারতম্যই ঝুঁকি। ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পার্থক্য যদিও অনিশ্চয়তা থেকে ঝুঁকির সৃষ্টি হয় তথাপিও ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। সব অনিশ্চয়তা ঝুঁকি নয়। অনিশ্চয়তার যে অংশটুকু পরিমাপ করা যায় সে অংশকে ঝুঁকি বলা যায়। আর যখন কোনো খারাপ ঘটনা ঘটার আশক্সকার প্রকৃতি জানা যায় না তাকে অনিশ্চয়তা বলে। ঝুঁকি পরিমাপযোগ্য অর্থাৎ ঝুঁকিকে পূর্বেই পরিমাপ করা যায়। কিন্তু অনিশ্চয়তাকে পরিমাপ করা যায় না। বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে ঝুঁকির পরিমাণ কমানো যায়। যেহেতু অনিশ্চয়তা পরিমাপ করা যায় না, তাই অনিশ্চয়তা হ্রাস করা যায় না। আর যেহেতু ঝুঁকি পরিমাপ করা যায় তাই ঝুঁকি হ্রাস করা যায়। ঝুঁকি পরিমাপের জন্য পরিমিত ব্যবধান, বিভেদাঙ্ক ইত্যাদি একক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অনিশ্চয়তা যেহেতু পরিমাপ করা যায় না, সেহেতু এরূপ কোনো একক ব্যবহারের প্রশ্নই থাকে না। ঝুঁকি পরিমাপযোগ্য বিধায় বিমাযোগ্য। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণকালে সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে কোনোভাবেই জ্ঞাত থাকা যায় না বিধায় অনিশ্চয়তা বিমাযোগ্য নয়। ঝুঁকির উৎস ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিকোণ থেকে : ক. ব্যবসায়িক ঝুঁকি : ব্যবসায় পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের খরচ যেমন : অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কাঁচামাল ইত্যাদি নির্বাহের প্রয়োজন হয়। এই খরচ মেটানোর ক্ষমতা নির্ভর করে আয়ের স্থিতিশীলতা, চলতি খরচের অনুপাত ইত্যাদির ওপর। বিক্রয় আয়ে অস্থিতিশীলতা, উচ্চ বা অধিক চলতি খরচ ব্যবসায়িক ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। বিক্রয়মূল্য, কাঁচামালের মূল্য অধিক পরিচালন ব্যয় ব্যবসায়িক ঝুকির উল্লেখযোগ্য উৎস। অর্থাৎ বন্যা, অগ্নিকাণ্ড, যুদ্ধ, দাঙ্গা, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি কারণে ব্যবসায়ের বিনিয়োগকৃত সম্পত্তি বিনষ্ট হয়ে ব্যবসায়ের মুনাফার ওপর যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তাই ব্যবসায়িক ঝুঁকি। খ. আর্থিক ঝুঁকি : যখন কোনো প্রতিষ্ঠান বাইরের কোনো উৎস হতে মূলধন সংগ্রহ করে তখন আর্থিক ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ ব্যবসায়ে অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রে ক্ষতির সম্ভাবনাকে আর্থিক ঝুঁকি বলে। এই অর্থ সুদসহ পরিশোধ করা হয় ব্যবসায়ের নগদ প্রবাহ থেকে। যদি ব্যবসায়ের নগদ প্রবাহ পর্যাপ্ত না থাকে তাহলে সুদ পরিশোধে অক্ষমতা দেখা দেয়। ফলে ঋণমূলধন সরবরাহকারী আইনানুগ ব্যবস্থা নিলে ব্যবসায় বন্ধ হওয়ায় ঝুঁকি থাকে। যে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ঋণ মূলধন যত বেশি সেই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি তত বেশি। অর্থাৎ মূলধন কাঠামোতে ব্যবসায়ের ঋণের পরিমাণ বেশি থাকলে আর্থিক ঝুঁকির আশঙ্কা বেশি থাকে। তাই ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও মূলধন কাঠামো দ্বারা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রিত হয়। বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে : ক. সুদ হারের ঝুঁকি : সুদের হারের পরিবর্তনের কারণে বিনিয়োগ যেমন : বন্ড, ডিবেঞ্চার ইত্যাদির মূল্য হ্রাস বৃদ্ধির আশঙ্কাকে সুদের হারের ঝুঁকি বলে। সাধারণত সুদের হার বাড়লে বন্ড, ডিবেঞ্চারের দাম কমে আবার সুদের হার কমলে এগুলোর বাজার মূল্য বাড়ে। খ. তারল্য ঝুঁকি : শেয়ার বন্ড বা ডিবেঞ্চারে অর্থ বিনিয়োগের পর ব্যবসায়ের প্রয়োজনে বিনিয়োগকারী যখন যথাযথ মূল্যে এগুলো বিক্রি করতে ব্যর্থ হয় তখন তারল্য ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। তারল্য ঝুঁকি বিনিয়োগকৃত বাজারের আকার এবং কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ঝুঁকির তাৎপর্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঝুঁকির বিশেষ ভ‚মিকা রয়েছে, যা ঝুঁকির তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত যেকোনো কোম্পানির সাফল্য তথা সার্বিক উদ্দেশ্য সাধনে ঝুঁকির প্রভাব রয়েছে। ফলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়েই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঘটনাসমূহ বিচার বিশ্লেষণ করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে প্রত্যাশিত ক্ষতি থেকে বাঁচা যায়। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জন নির্ভর করে পণ্যের চাহিদার ওপর। বাজারের প্রকৃত চাহিদা অনুমেয় চাহিদা থেকে কম বা বেশি হতে পারে। সঠিক চাহিদা নিরূপণ করে মুনাফা অর্জন করতে হলে এক্ষেত্রে ঝুঁকিগত দিক বিবেচনা করা অপরিহার্য। অর্থাৎ যদি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পণ্যের চাহিদা বিশ্লেষণ না করে পণ্য উৎপাদন করে তবে অধিক অবিক্রীত পণ্য বা পণ্য সরবরাহে ঘাটতির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে যা কি-না ব্যবসায়ের মূল উদ্দেশ্য অর্জনের অন্তরায় হতে পারে। ঝুঁকিমুক্ত আয় ও ঝুঁকিবহুল আয় ঝুঁকিমুক্ত আয়ে প্রকৃত আয় সব সময় প্রত্যাশিত আয়ের সমান হয়। কোনো ব্যাংকে যদি মেয়াদি আমানত রাখা হয় তবে এর প্রত্যাশিত আয় ও প্রকৃত আয়ের মধ্যে তেমন পার্থক্য হয় না। এটা ঝুঁকিমুক্ত আয়ের একটি ধরন যেমন : সরকারি ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ইত্যাদি। অন্যদিকে যেসব আয়ের সাথে ঝুঁকি জড়িত সেসব আয়কে ঝুঁকিবহুল আয় বলা হয়। যেমন : শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ, একটি ঝুঁকিবহুল আয় হিসেবে পরিগণিত। ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার পরিমাণ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সফলভাবে পরিচালনার জন্য ঝুঁকি পরিমাপ করা অত্যাবশ্যকীয়। প্রত্যাশিত আয় থেকে প্রকৃত আয়ের বিচ্যুতি থেকেই ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। এ কারণে প্রত্যাশিত আয় ও প্রকৃত আয়ের বিচ্যুতি বা প্রত্যাশিত ফলাফল এবং প্রকৃত ফলাফলের বিচ্যুতি থেকে ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়। ঝুঁকি পরিমাপের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। তার মধ্যে আদর্শ বিচ্যুতি পরিমাপ পদ্ধতি অন্যতম। আদর্শ বিচ্যুতি আদর্শ বিচ্যুতি একটি পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি। অতীত অর্জিত আয়ের ব্যবধান থেকে ঝুঁকি পরিমাপ এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশিত আয়ের ঝুঁকি পরিমাপের একটি পদ্ধতি হচ্ছে আদর্শ বিচ্যুতি। এর সূত্র হলো : আদর্শ বিচ্যুতি = (আয় হার গড় হার)২ হ – ১ এখানে, (আয় হার গড় হার)২ = অতীতে অর্জিত আয় হার থেকে গড় আয় হারের পার্থক্যের বর্গের সমষ্টি। হ = বছরের সংখ্যা। অনুশীলনীর সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর প্রশ্ন-১ নিচের উদ্দীপকটি পড়ে প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও : রায়না হক ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ শেষে অনেক চিন্তাভাবনার পর ‘আহŸান ক্রায়াট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এটি ঢাকা ও কুমিল্লা শহরে অবস্থিত। তার বান্ধবী রোমানা টেক্সটাইল ইনস্টিটিউট থেকে পাস করে মনিপুরী তাঁত বস্ত্রের বিভিন্ন পোশাক সামগ্রীর ব্যবসা শুরু করে সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে। তাদের কয়েক বছরের ব্যবসায়ের চিত্র নিচে দেয়া হলো। ক. অতীতে অর্জিত আয়ের বিচ্যুতি থেকে কী পরিমাপ করা হয়? খ. ব্যবসায় ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফলের চাইতে প্রকৃত ফল কম হবার কারণটি ব্যাখ্যা কর। গ. রোমানার ব্যবসায় কম সাফল্য হবার কারণ বর্ণনা কর। ঘ. রায়না ও রোমানার ব্যবসায়িক চিত্রটির তুলনামূলক বিশ্লেষণ কর। ১নং প্রশ্নের উত্তর ক. অতীতে অর্জিত আয়ের বিচ্যুতি থেকে ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়। খ. ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফলের চাইতে প্রকৃত ফল কম হবার কারণ হলো ঝুঁকি। ভবিষ্যৎ সর্বদা অনিশ্চিত আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অনিশ্চয়তার যে অংশ পরিমাপ করা যায় তাই ঝুঁকি। কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, আশানুরূপ বিক্রয় না হওয়া এবং প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করতে না পারার ঝুঁকির কারণে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করা সম্ভব হয়